ইসলামের এক মহান ইবাদত – নিয়ম, প্রকারভেদ ও মাসায়েল
হজ্জ হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের জন্য জীবনে একবার হজ্জ পালন করা ফরজ। এটি কেবল একটি শারীরিক ভ্রমণ নয়, বরং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। প্রতি বছর জিলহজ্জ মাসে পবিত্র মক্কায় বিশ্বের লাখো মুসলিম একত্রিত হয়ে এই মহান ইবাদত সম্পন্ন করেন। হজ্জের প্রতিটি ধাপে রয়েছে সুন্নাহসম্মত নিয়ম ও মাসায়েল, যা জানা প্রতিটি হাজীর জন্য অপরিহার্য।
১. হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত
হজ্জের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি গুনাহ মুক্তির ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক বিশাল সুযোগ।
- ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ: হজ্জ ইসলামের মৌলিক পাঁচ ভিত্তির একটি।
- গুনাহ মাফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমনভাবে হজ্জ করল যে, তাতে কোনো অশ্লীল কাজ করল না এবং কোনো পাপ করল না, সে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এলো।” (বুখারী ও মুসলিম)
- জান্নাতের নিশ্চয়তা: “মাবরুর হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” (বুখারী ও মুসলিম)
- মুসলিম উম্মাহর ঐক্য: হজ্জ বিশ্বের সকল মুসলিমকে এক স্থানে, একই পোশাকে, একই উদ্দেশ্যে একত্রিত করে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
২. হজ্জের প্রকারভেদ
নিয়ত ও ইহরাম বাঁধার পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে হজ্জ মূলত তিন প্রকার:
| প্রকার | বিবরণ | করণীয় |
| তামাত্তু (أداء تمتع) | হজ্জের মাসসমূহে (শাওয়াল, যিলকদ, যিলহজ্জ) ওমরাহ করার পর ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যাওয়া এবং একই বছর হজ্জের জন্য পুনরায় ইহরাম বাঁধা। | প্রথমে ওমরাহ, পরে হজ্জ। একটি কুরবানি ওয়াজিব। |
| কিরান (أداء قران) | ওমরাহ ও হজ্জ উভয়ের জন্য একই সঙ্গে ইহরাম বাঁধা এবং একই ইহরামে দুটি ইবাদত সম্পন্ন করা। | একই ইহরামে ওমরাহ ও হজ্জ। একটি কুরবানি ওয়াজিব। |
| ইফরাদ (أداء إفراد) | শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধা। ওমরাহ বাদ দেওয়া। | শুধু হজ্জ। কুরবানি ওয়াজিব নয়, তবে নফল হিসেবে দেওয়া যায়। |
বাংলাদেশে সাধারণত ‘তামাত্তু’ হজ্জ বেশি প্রচলিত ও সুবিধাজনক।
৩. হজ্জের মূল কাজসমূহ (ফারজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত)
হজ্জের আমলগুলো মূলত ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাত – এই তিন ভাগে বিভক্ত।
ক. হজ্জের ফরজ (Hajjer Farz)
১. ইহরাম (الإحرام): মিকাত থেকে নিয়ত করে হজ্জের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক (ইহরাম) পরিধান করা।
২. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (الوقوف بعرفة): জিলহজ্জের ৯ তারিখ দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত (طواف الإفاضة): ১০ জিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের মধ্যে কাবা শরীফের চারপাশে সাতবার তাওয়াফ করা।
খ. হজ্জের ওয়াজিব (Hajjer Wajib)
১. মিকাত (ميقات) থেকে ইহরাম: মিকাত অতিক্রম করার আগে ইহরাম বাঁধা।
২. সাফা-মারওয়ার সা’ঈ (السعي بين الصفا والمروة): সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার দৌড়ানো।
৩. আরাফা থেকে ফেরার পথে মুযদালিফায় অবস্থান (الوقوف بمزدلفة): ৯ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর থেকে ১০ জিলহজ্জ ফজরের আগে পর্যন্ত মুযদালিফায় অবস্থান।
৪. শয়তানকে পাথর মারা (رمي الجمرات): জামারাতে (শয়তানকে) পাথর নিক্ষেপ করা।
৫. কুরবানি (الذبح): তামাত্তু ও কিরান হজ্জকারীদের জন্য কুরবানি করা।
৬. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা (الحلق أو التقصير): তাওয়াফে জিয়ারতের আগে চুল কাটা বা মুণ্ডন করা।
৭. তাওয়াফে বিদা’ (طواف الوداع): মক্কা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা।
৮. আইয়ামে তাশরীকে (১১, ১২, ১৩ জিলহজ্জ) মিনায় রাত কাটানো (المبيت بمنى): কিছু কিছু ফিকাহবিদদের মতে এটি ওয়াজিব।
গ. হজ্জের সুন্নাত (Hajjer Sunnat)
- তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ (দ্রুতগতিতে হাঁটা)।
- ইহরামের আগে গোসল করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা।
- তাওয়াফের পর মাকামে ইবরাহিমের কাছে দুই রাকাত নামাজ পড়া।
- জিলহজ্জের ৮ তারিখ মিনায় অবস্থান করা।
- মিনায় ৯ তারিখ ফজর পর্যন্ত রাত কাটানো।
- বিভিন্ন আমলের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া ও যিকির পাঠ করা ইত্যাদি।
৪. ধাপে ধাপে হজ্জ পালনের বিস্তারিত নিয়ম-কানুন
হজ্জের মূল আমলগুলো জিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখ থেকে শুরু হয়ে ১৩ তারিখ পর্যন্ত চলে।
১: ইহরাম ও মিকাত (৮ জিলহজ্জের আগে)
- ইহরামের প্রস্তুতি: নখ কাটা, গোঁফ ও বগলের লোম পরিষ্কার করা। গোসল করে সুগন্ধি ব্যবহার করা।
- ইহরামের পোশাক: সেলাইবিহীন সাদা দুই টুকরো কাপড় পরিধান করা।
- নিয়ত ও তালবিয়া: মিকাত থেকে কিবলামুখী হয়ে হজ্জের নিয়ত করা এবং জোরে তালবিয়া (لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ…) পড়া। ইহরাম অবস্থায় সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা।
২: মিনা যাত্রা (৮ জিলহজ্জ – ইয়াওমুত তারবিয়াহ)
- ৮ জিলহজ্জ সকালে মক্কার হারাম শরীফ থেকে মিনায় গিয়ে অবস্থান করা এবং যোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও পরের দিন ফজর – এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিজ নিজ সময়ে আদায় করা।
৩: আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (৯ জিলহজ্জ – ইয়াওমুল আরাফাহ)
- ৯ জিলহজ্জ ফজরের পর মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে যাওয়া।
- যোহর ও আসরের নামাজ একত্রে ও কসর করে আদায় করা (জাম’ ও কসর)।
- গুরুত্বপূর্ণ সময়: যোহরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিবলামুখী হয়ে দোয়া, যিকির ও ইস্তিগফারে মগ্ন থাকা (এটি হজ্জের মূল পর্ব)।
- সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাজ না পড়েই মুযদালিফার দিকে রওনা হওয়া।
৪: মুযদালিফায় রাত যাপন ও পাথর সংগ্রহ (৯ জিলহজ্জ রাত)
- মুযদালিফায় পৌঁছে এশা ও মাগরিবের নামাজ একত্রে আদায় করা।
- ফজরের নামাজের পর সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত মুযদালিফায় অবস্থান করা।
- শয়তানকে মারার জন্য এখান থেকে ছোট ছোট ৪৯টি পাথর সংগ্রহ করা।
৫: কুরবানি, পাথর নিক্ষেপ ও হালাল হওয়া (১০ জিলহজ্জ – ইয়াওমুন নহর)
- জামারাতে কুবরায় পাথর নিক্ষেপ: সূর্য ওঠার পর মিনা পৌঁছে বড় জামারাতে (জামারাতে কুবরা/আকাবা) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করা।
- কুরবানি: তামাত্তু ও কিরান হজ্জকারীরা কুরবানি সম্পন্ন করা।
- মাথা মুণ্ডন/চুল ছোট করা (হাল্ক/তাকসীর): চুল মুণ্ডন (পুরুষদের জন্য উত্তম) বা ছোট করার মাধ্যমে ইহরামের প্রথম ধাপের নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হওয়া।
- পোশাক পরিবর্তন: এখন সাধারণ পোশাক পরিধান করা যাবে, তবে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস ছাড়া বাকি সব নিষেধাজ্ঞা মুক্ত।
- তাওয়াফে জিয়ারত: মক্কায় গিয়ে কাবা শরীফের ‘তাওয়াফে জিয়ারত’ সম্পন্ন করা। এরপর স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসসহ সব নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।
৬: আইয়ামে তাশরীকে (১১, ১২, ১৩ জিলহজ্জ)
- মিনায় রাত যাপন: মিনায় রাত কাটানো (এটি ওয়াজিব)।
- পাথর নিক্ষেপ: ১১ ও ১২ জিলহজ্জ তারিখে সূর্য ঢলে পড়ার পর (যোহরের পর) ছোট, মধ্যম ও বড় – এই তিন জামারাতে সাতটি করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা।
- যদি ১৩ জিলহজ্জ তারিখেও মিনায় অবস্থান করা হয়, তবে সেদিনও ২১টি পাথর নিক্ষেপ করতে হবে।
৭: বিদায়ী তাওয়াফ (ফিরে আসার আগে)
- মক্কা ত্যাগ করার আগে অবশ্যই তাওয়াফে বিদা’ (বিদায়ী তাওয়াফ) সম্পন্ন করতে হবে। এটি হজ্জের শেষ ওয়াজিব আমল। মহিলাদের পিরিয়ড চলাকালে এটি মাফ।
৫. হজ্জের মাসায়েল ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- ইহরামের নিষেধাজ্ঞা: ইহরাম অবস্থায় চুল/নখ কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাই করা পোশাক পরা (পুরুষদের জন্য), শিকার করা, যৌন মিলন/উদ্দীপক কাজ ইত্যাদি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- ‘রমল’ ও ‘ইযতিবা’: তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে দ্রুত তালে হাঁটা (রমল) এবং ইহরামের চাদরের এক পাশ ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া (ইযতিবা) পুরুষদের জন্য সুন্নাত। সা’ঈতে রমল নেই।
- মহিলাদের মাসায়েল: মহিলাদের জন্য জোরে তালবিয়া না পড়া, মাথা মুণ্ডন না করে চুলের অগ্রভাগ সামান্য ছাঁটা, সা’ঈতে দ্রুত না হাঁটা, এবং তাওয়াফে বিদা’ মাফ হওয়া—এইগুলো বিশেষ মাসায়েল।
- বদলি হজ্জ: কোনো ব্যক্তি যদি হজ্জ করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজে যেতে না পারে, তবে তার পক্ষ থেকে অন্য কাউকে দিয়ে হজ্জ করানো বৈধ।
- ভুল হলে করণীয়: হজ্জের কোনো ফরজ বাদ গেলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে এবং তা পুনরায় আদায় করতে হবে। ওয়াজিব বাদ গেলে ‘দম’ (একটি কুরবানি) দিতে হবে। সুন্নাত ছুটে গেলে হজ্জের কোনো ক্ষতি হবে না।
উপসংহার
হজ্জ শুধু একটি সফর নয়, এটি মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আল্লাহর ঘরের মেহমান হিসেবে এই সফরে প্রতিটি হাজীর উচিত সর্বোচ্চ ধৈর্য, বিনয় ও ইখলাসের সাথে সমস্ত আমল সম্পন্ন করা। সঠিক নিয়মের জ্ঞান এবং নিষ্ঠার সাথে পালন করা প্রতিটি আমলই যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে মাবরুর হজ্জ নসীব করুন।






