🌙 রমজানে পবিত্র ওমরাহ

Umrah in Ramadan

এক হজ সমতুল্য ইবাদতের হাতছানি

পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ নেয়ামত। এটি রহমত, মাগফিরাত (ক্ষমা) এবং নাজাত (মুক্তি) লাভের মাস। এই মাসে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর তাই, এই বরকতময় মাসে পবিত্র ওমরাহ পালনের গুরুত্ব ও ফজিলত অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এটিকে হজের সমতুল্য সওয়াবের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

রমজানে ওমরাহর বিশেষ ফজিলত: হজের সওয়াব

ওমরাহ সারা বছরই পালন করা যায়, তবে রমজান মাসে এর গুরুত্ব ও মর্যাদা আকাশচুম্বী। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক হাদিস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায়:

হাদিস: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে ওমরাহ করা আমার সঙ্গে হজ আদায় করার সমতুল্য।” (সহীহ বুখারী: ১৮৬৩)

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রমজান মাসে ওমরাহ করলে একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তির হজের সওয়াবের সমান সওয়াব লাভের সুযোগ থাকে। যদিও এটি হজের মূল ফরজ পালনের বিকল্প নয়, তবে যারা বিভিন্ন কারণে হজে যেতে পারেন না, তারা এই মাসে ওমরাহ করে সেই মহৎ সওয়াব অর্জন করতে পারেন।


🕋 ওমরাহ: পাপ মোচন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যম

ওমরাহ শব্দের অর্থ হলো ‘দর্শন বা জিয়ারত করা’। শরিয়তের পরিভাষায়, ইহরাম বাঁধা, কাবা শরিফের তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ি করা এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার মাধ্যমে ওমরাহ সম্পন্ন হয়। ওমরাহ পালনের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কেও হাদিসে এসেছে:

  • গুনাহ মাফ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ওমরাহ থেকে পরবর্তী ওমরাহ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সব গুনাহের কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) হয়ে যায়।” (সহীহ বুখারী: ১৭৭৩)
  • দারিদ্র্য দূর: আরও এক হাদিসে তিনি বলেন, তোমরা বারবার হজ ও ওমরাহ আদায় করো, কেননা এ দুটি দারিদ্র্য ও গুনাহকে দূর করে দেয়, যেভাবে আগুন ধাতুর জং পুড়িয়ে ফেলে।” (সুনানে নাসায়ি: ২৮৮৭)

রমজানের পবিত্রতা ও বরকতের সঙ্গে এই ফজিলতগুলো যুক্ত হওয়ায়, এই মাসে ওমরাহ পালনকারী আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভে ধন্য হন।


🤲 রমজানে ওমরাহ পালনের অতিরিক্ত আমলসমূহ

রমজানে ওমরাহর সফরে থাকাকালীন আরও কিছু আমলের মাধ্যমে মুমিন তার ইবাদতকে পূর্ণতা দিতে পারেন এবং অধিক সওয়াব লাভ করতে পারেন:

  • রোজা পালন: সিয়াম বা রোজা রমজান মাসের অন্যতম ফরজ ইবাদত। ওমরাহ পালনের সময় রোজা রাখা মুমিনের আধ্যাত্মিক যাত্রাকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
  • সময়মতো জামাতে নামাজ: মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থানগুলোতে জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে মসজিদে হারামে এক রাকাত নামাজের সওয়াব এক লাখ রাকাতের সমান বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
  • কোরআন তিলাওয়াত ও শিক্ষা: রমজান কোরআন নাজিলের মাস। ওমরাহর সফরে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, হিফজ বা অন্যদের শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
  • এতেকাফ: রমজানের শেষ দশকে মসজিদুল হারাম বা মসজিদে নববীতে এতেকাফ করার সুযোগ পাওয়া এক বিশাল সৌভাগ্য।
  • দান-সদকা: এ মাসে দান-খয়রাত ও গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করার সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

রমজান মাস যেহেতু দোয়া কবুলের মাস, তাই এই পবিত্র স্থানগুলোতে ইবাদতের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে নিজের এবং উম্মাহর জন্য দোয়া করা মুমিনের কর্তব্য।


📝 রমজানে ওমরাহ পালনের প্রস্তুতি

রমজানে ওমরাহর সফরে সওয়াব যেমন বেশি, তেমনি ভিড় ও কষ্টও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তাই সফল ও বরকতময় সফরের জন্য কিছু প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি:

  • শারীরিক প্রস্তুতি: রোজার কারণে যেন দুর্বলতা না আসে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সাহরি-ইফতারে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
  • মানসিক প্রস্তুতি: ভিড় ও গরমের কারণে সৃষ্ট যেকোনো অসুবিধা ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করার মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। সব ধরনের ব্যস্ততা পরিহার করে কেবল ইবাদতে মনোনিবেশ করতে হবে।
  • সফরের পরিকল্পনা: রমজানের প্রথম, মধ্য বা শেষ দশক – সফরের জন্য কোন সময়টি বেছে নেওয়া হবে, তা আগে থেকে ঠিক করে নিতে হবে। শেষ দশক সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ হলেও ভিড়ও অনেক বেশি থাকে।
  • প্রয়োজনীয় সামগ্রী: আরামদায়ক ও সাদা রঙের ইহরামের কাপড়, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি পণ্য, ঔষধপত্র (যদি লাগে), এবং স্থানীয় আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত পোশাক সঙ্গে রাখা আবশ্যক।

🎯 উপসংহার: আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ

রমজান মাস আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের এক স্বর্ণালী সুযোগ নিয়ে আসে। আর এই মাসে পবিত্র ওমরাহ পালনের সুযোগ পাওয়া একজন মুমিনের জীবনে এক বিশাল প্রাপ্তি। এর মাধ্যমে কেবল হজের সমতুল্য সওয়াবই অর্জিত হয় না, বরং আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে তাঁর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভের এক অসামান্য সুযোগ তৈরি হয়।

যারা সামর্থ্য রাখেন, তাদের উচিত এই বরকতময় মাসকে কাজে লাগিয়ে ওমরাহ পালনের মাধ্যমে নিজেদের ইহকাল ও পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানে তাঁর পবিত্র ঘর জিয়ারত করে সর্বোচ্চ ফজিলত হাসিল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)।

Latest Post