ইসলামে নারী ও পুরুষের ইহরাম সম্পর্কিত বিধান

ইহরাম বাঁধার নিয়ম

ইহরামের নিয়মাবলী ও এর গুরুত্বঃ

🕋 হজ্জ বা উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যখন কোনো মুসলিম মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন, তখন তাঁকে একটি বিশেষ অবস্থায় প্রবেশ করতে হয়, যা ইহরাম নামে পরিচিত। ইহরাম হলো ইবাদতের জন্য আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করার এবং পার্থিব আকর্ষণ থেকে নিজেকে বিরত রাখার একটি পবিত্র অঙ্গীকার। এই অবস্থায় নারী ও পুরুষের জন্য কিছু নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান এবং কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক।

আসুন, ইসলামে নারী ও পুরুষের ইহরাম সম্পর্কিত বিস্তারিত বিধানগুলো জেনে নেওয়া যাক।

ইহরামের পোশাক- নারী ও পুরুষের পার্থক্যঃ-

ইহরামের পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য ভিন্ন বিধান রয়েছে।

১) পুরুষদের ইহরামঃ পুরুষদের জন্য ইহরামের পোশাকে সেলাইবিহীন দুই টুকরা সাদা কাপড় পরা বাধ্যতামূলক।

  • ইজার (Lungi): কোমরের নিচের অংশ আবৃত করার জন্য একটি কাপড়।
  • রিদা (Chadar): কাঁধ থেকে শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার জন্য অন্য একটি কাপড়।

পুরুষদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলীঃ-

  • সেলাইবিহীন পোশাকঃ ইহরাম অবস্থায় কোনো প্রকার সেলাই করা কাপড় পরা যাবে না (যেমনঃ শার্ট, ট্রাউজার, মোজা, টুপি ইত্যাদি)।
  • মাথা আবৃত করা নিষেধঃ পুরুষদের জন্য মাথা ঢাকা নিষেধ।
  • জুতা পরিধানঃ এমন জুতা পরিধান করতে হবে যা পায়ের গোড়ালি (Gira) এবং পায়ের পাতার মাঝের উঁচু অংশ (Mura) ঢেকে না ফেলে।

২) নারীদের ইহরামঃ নারীদের জন্য পুরুষের মতো কোনো নির্দিষ্ট সেলাইবিহীন পোশাক নেই।

  • সাধারণ শালীন পোশাকঃ নারীরা ইহরামের জন্য তাদের স্বাভাবিক শালীন পোশাকই পরিধান করবেন। এই পোশাক হতে হবে সতর (আবরু) আবৃতকারী, ঢিলেঢালা, আঁটসাঁট বা আকর্ষণীয় নয়।
  • হাতমোজা ও নিকাবঃ ইহরাম অবস্থায় নারীরা হাতমোজা (Gloves) পরিধান করতে পারবেন না এবং মুখমণ্ডলে নিকাব লাগিয়ে রাখতে পারবেন না।

নারীদের জন্য পর্দার বিশেষ বিধানঃ-

যদিও ইহরামের অবস্থায় মুখমণ্ডল খোলা রাখার বিধান, কিন্তু গায়রে মাহরাম (যাদের সাথে বিয়ে বৈধ) পুরুষদের সামনে পড়লে নারীরা অবশ্যই মুখমণ্ডল আবৃত করবেন।

  • পর্দার পদ্ধতিঃ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)- এর হাদিস অনুসারে, পরপুরুষ সামনে এলে নারীরা তাদের মাথার উপর থেকে চাদর বা ওড়না ঝুলিয়ে মুখমণ্ডল ঢেকে নেবেন, তবে কাপড় যেন মুখমণ্ডলে লেগে না থাকে। এক্ষেত্রে বাজারে এমন ক্যাপ বা ফ্রেম পাওয়া যায় যা ব্যবহার করে কাপড় মুখের স্পর্শ ছাড়াই ঝুলিয়ে রাখা যায়।
  • জুতা-মোজাঃ নারীরা স্বাভাবিক অবস্থায় যেমন জুতা বা মোজা পরেন, ইহরাম অবস্থায়ও তা পরিধান করতে পারবেন।

ইহরামের সাধারণ নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ (নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য)

একবার ইহরামের নিয়্যত করার পর নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য কিছু কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এই নিষিদ্ধ কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ-

  • সুগন্ধি ব্যবহারঃ শরীরে বা পোশাকে কোনো ধরনের সুগন্ধি (পারফিউম, আতর, সুগন্ধি সাবান) ব্যবহার করা নিষেধ।
  • নখ ও চুল কাটাঃ শরীরের কোনো স্থান থেকে নখ, চুল বা লোম কাটা বা অপসারণ করা নিষিদ্ধ।
  • শিকার করাঃ বন্য প্রাণী শিকার করা বা শিকারীকে সাহায্য করা যাবে না।
  • যৌন সম্পর্কঃ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা এ সংক্রান্ত কোনো কাজ করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
  • ঝগড়া- বিবাদঃ অন্যের সাথে ঝগড়া বা অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করা যাবে না।
  • বিবাহ প্রস্তাবঃ ইহরাম অবস্থায় বিবাহ বা বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া নিষেধ।

ইহরামের প্রস্তুতি ও সূচনা (নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য)

ইহরামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কিছু সুন্নত বা মুস্তাহাব কাজ রয়েছে।

  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাঃ ইহরাম বাঁধার আগে নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা এবং গোসল করে নেওয়া মুস্তাহাব। ঋতুমতী নারীর জন্যও গোসল করা মুস্তাহাব।
  • নামাজঃ সম্ভব হলে গোসলের পর দুই রাকাত ‘সালাতুল ইহরাম’ আদায় করা।
  • নিয়্যত ও তালবিয়াঃ নির্দিষ্ট মীকাত (ইহরাম বাঁধার স্থান) থেকে হজ্জ বা উমরার নিয়্যত করে নিতে হয়। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা যেতে পারে, তবে অন্তরে সংকল্প করাই আসল। নিয়্যতের পরপরই উচ্চস্বরে তালবিয়া (لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ…) পড়তে শুরু করতে হবে (নারীরা নিচু স্বরে পড়বেন, পুরুষেরা উচ্চস্বরে)।

পরিশেষেঃ-

ইহরাম শুধুমাত্র একটি পোশাক বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রবেশদ্বার। নারী ও পুরুষ উভয়েরই উচিত ইসলামের এই বিশেষ বিধানগুলো সঠিকভাবে জেনে ও মেনে নিয়ে ইহরামের পবিত্রতা রক্ষা করা, যাতে তাদের হজ্জ বা উমরাহ আল্লাহ তাআলার দরবারে কবুল হয়। এই পবিত্র যাত্রায় আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

Latest Post