পবিত্র কাবার ছায়ায় এক জান্নাতি স্থান: ইতিহাস, রহস্য ও ফজিলত
কাবা শরিফের উত্তর দিকে অবস্থিত অর্ধবৃত্তাকার দেয়ালঘেরা স্থানটিকে ‘হাতিম’ বা ‘হিজরে ইসমাইল’ বলা হয়। ইসলামি শরিয়ত ও ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই স্থানটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। হাজিদের কাছে এটি বিশেষ আবেগের জায়গা, কারণ এখানে নামাজ পড়া মানে খোদ কাবা ঘরের ভেতরে নামাজ পড়া।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, কাবার মূল কাঠামোর বাইরে এই অংশটি কেন? এর গুরুত্বই বা কী?
আমরা এখানে জানবো হাতিমের পেছনের ইতিহাস এবং এর অবিশ্বাস্য ফজিলত সম্পর্কে।
পরিচয় ও নামকরণ
এই স্থানটির মূলত দুটি নাম বেশি প্রচলিত।
হিজরে ইসমাইল (হিজর): ‘হিজর’ শব্দের অর্থ কোল বা ভূখণ্ড। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশু পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে মক্কায় রেখে যান, তখন তাঁদের থাকার জন্য এই স্থানেই খেজুর গাছের ডাল দিয়ে একটি ছাদ বা কুঁড়েঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। মা ও ছেলের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি তাই ‘হিজরে ইসমাইল’ নামে পরিচিত।
হাতিম: ‘হাতিম’ শব্দের অর্থ ভগ্ন বা বিচ্ছিন্ন অংশ। যেহেতু কুরাইশরা কাবা পুনর্নির্মাণের সময় অর্থের অভাবে এই অংশটিকে মূল ভবন থেকে বাদ দিয়ে বা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, তাই একে হাতিম বলা হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন কাবা ঘর নির্মাণ করেছিলেন, তখন এই হাতিম বা হিজরে ইসমাইল কাবা ঘরের মূল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ, কাবা ঘর তখন বর্তমানের মতো চারকোনা (Cube) ছিল না, বরং তা ছিল আয়তাকার এবং হাতিম এর পেটের ভেতরে ছিল।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির ৫ বছর আগে মক্কায় ভয়াবহ বন্যায় কাবা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন কুরাইশরা কাবা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা শর্ত করে যে, এই পবিত্র ঘর নির্মাণে কেবল হালাল উপার্জন ব্যবহার করা হবে; কোনো সুদ, ঘুষ বা অন্যায় পথের টাকা নেওয়া হবে না। কিন্তু হালাল অর্থের সংকুলান না হওয়ায় তারা কাবার মূল দৈর্ঘ্য কমিয়ে দেয় এবং উত্তর দিকের (হাতিমের) অংশটি বাদ দিয়ে দেয়াল তুলে দেয়। তবে সীমানা চিহ্নিত করার জন্য হাতিমের অংশটি নিচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়।
ধর্মীয় গুরুত্ব ও ফজিলত
ইসলামে এই স্থানটির গুরুত্ব অপরিসীম।
কাবার অংশ: যদিও এটি মূল ভবনের বাইরে, কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি কাবার মূল অংশেরই অন্তর্ভুক্ত। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, মা আয়েশা (রা.) একবার কাবার ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ পড়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন নবীজি (সা.) তাঁর হাত ধরে হাতিমে নিয়ে যান এবং বলেন, “তুমি যদি কাবার ভেতরে নামাজ পড়তে চাও, তবে এখানে পড়। কারণ এটি কাবারই অংশ।”
দোয়া কবুলের স্থান: হাতিমে দাঁড়িয়ে দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। বিশেষ করে ‘মিজাবে রহমত’ (কাবার ছাদের সোনার পরনালা) এর নিচে দাঁড়িয়ে দোয়া করা অত্যন্ত বরকতময়।
তাওয়াফ সংক্রান্ত বিধান: যেহেতু হাতিম কাবার অংশ, তাই তাওয়াফ করার সময় অবশ্যই হাতিমের দেয়ালের বাইরে দিয়ে ঘুরতে হবে। কেউ যদি হাতিমের ভেতর দিয়ে হেঁটে শর্টকাট করেন, তবে তার সেই চক্কর বা তাওয়াফ বাতিল বলে গণ্য হবে।
হাতিম বা হিজরে ইসমাইল মুসলিম উম্মাহর জন্য এক আবেগের নাম। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় হালাল উপার্জনের গুরুত্ব এবং আল্লাহর ঘরের পবিত্রতা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনে অন্তত একবার হলেও এই পবিত্র স্থানে সেজদা দেওয়ার তৌফিক দান করুন।






