যেখানে হৃদয়ের আকুতি কবুল হয়
পবিত্র মক্কা নগরী, যেখানে অবস্থিত মুসলিম উম্মাহর কিবলা পবিত্র কাবা শরীফ। এই ঘরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি স্থান মুসলিম হৃদয়ে গভীর ভক্তি ও ভালোবাসার জন্ম দেয়। আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতে গিয়ে একজন মুমিন যে কয়েকটি স্থানে বিশেষ আবেগ ও অনুভূতি অনুভব করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘মুলতাজাম’।
‘মুলতাজাম’ কোনো সাধারণ দেয়াল নয়; এটি দোয়া কবুলের এক জীবন্ত ইতিহাস, ইবাদতের এক পবিত্রতম স্থান। যারা হজ বা ওমরাহ পালনে মক্কায় যান, তাদের কাছে এটি এক পরম কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের নাম, যেখানে বুক পেতে আল্লাহর কাছে নিজেদের সব আকুতি তুলে ধরা যায়।
✨ মুলতাজাম কী?
আরবিতে ‘ মুলতাজাম ‘ (الملتزم) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘আঁকড়ে ধরার স্থান’ বা ‘লেগে থাকার স্থান’। স্থানটি হলো পবিত্র কাবা ঘরের হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) ও কাবা শরীফের দরজার মধ্যবর্তী দেয়ালের অংশ। এই অংশটি প্রায় দুই মিটার বা ছয় ফুট লম্বা।
তাওয়াফ শেষ করার পর অথবা অন্য যেকোনো সময় সুযোগ পেলে আল্লাহর বান্দারা এখানে গিয়ে বুক, মুখমণ্ডল ও হাত দ্বারা কাবার দেয়াল আঁকড়ে ধরে বিনয় ও কান্নার সঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এই স্থানের এই নাম হওয়ার কারণ হলো, এখানে দাঁড়িয়ে বান্দা নিজের সব আবেগ দিয়ে আল্লাহর ঘরকে আঁকড়ে ধরে তাঁর রহমত ও মাগফিরাত কামনা করেন।
📜 মুলতাজামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মুলতাজামের তাৎপর্য কেবল এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নত এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল।
১) নবীজীর (সাঃ) সুন্নাহ:
বিভিন্ন হাদিস ও বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কা বিজয়ের পর এবং অন্যান্য সময়ে এই পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে দোয়া করেছেন।
বর্ণনা অনুযায়ী: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুলতাজামে গিয়ে ডান গাল, বুক ও পেট ঠেকিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দোয়া করতেন। তিনি এত বেশি কেঁদেছিলেন যে, তাঁর দাঁড়ি মোবারক, বুক ও পেট ভিজে গিয়েছিল। এটি ছিল আল্লাহর কাছে তাঁর আকুতি ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনার পর থেকেই স্থানটি দোয়া কবুলের জন্য বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
২) সাহাবায়ে কেরামের আমল:
নবীজীর (সাঃ) দেখানো পথ অনুসরণ করে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-ও মুলতাজামকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তাঁরাও এখানে বুক ও গাল লাগিয়ে, হাত প্রসারিত করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে নিজেদের প্রয়োজন ও গুনাহের ক্ষমা চাইতেন। এই আমল প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
🤲 কেন মুলতাজাম দোয়া কবুলের বিশেষ স্থান?
মুলতাজামকে দোয়া কবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়। এর কয়েকটি বিশেষ কারণ হলো:
- রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আমল: নবী করিম (সাঃ) স্বয়ং এই স্থানে দোয়া করেছেন এবং তা কবুল হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করেন।
- আঁকড়ে ধরার তাৎপর্য: এই স্থানে বান্দা সরাসরি আল্লাহর ঘরের অংশকে আঁকড়ে ধরেন। এটি যেন দয়ার সাগর আল্লাহর কাছে নিজের ক্ষুদ্রতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করার এক নীরব ভাষা। কোনো অসহায় যেমন রক্ষাকারীর আঁচল আঁকড়ে ধরে, ঠিক তেমনি মুমিন এখানে আল্লাহর ঘরের দেয়াল ধরে তাঁর দয়া প্রার্থনা করে।
- হৃদয়ের গভীরতম আকুতি: মুলতাজাম এমন এক স্থান, যেখানে আল্লাহর প্রতি বান্দার সর্বোচ্চ আত্মসমর্পণ ও বিনয় প্রকাশিত হয়। একজন মুমিন যখন আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁধ, মুখমণ্ডল এবং বুক দিয়ে মুলতাজামকে স্পর্শ করে, তখন তাঁর হৃদয়ের গভীরতম আকুতি আল্লাহর দরবারে পৌঁছায়।
মুস্তাহাব আমল:
এই স্থানে দোয়া করার একটি বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে, যা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। এখানে বুক ও ডান গাল কাবার দেয়ালে ঠেকানো, এবং দুই হাত মাথার ওপর দিয়ে দেয়ালের উপর রাখা সুন্নত। সম্ভব হলে দাঁড়িয়ে, অন্যথায় যেভাবে সম্ভব কাবার দেয়াল স্পর্শ করে দোয়া করা যেতে পারে।
🚧 বর্তমান প্রেক্ষাপট ও করণীয়
কাবা শরীফে সবসময় প্রচুর সংখ্যক মানুষের ভিড় থাকে। বিশেষ করে হজ ও ওমরাহর মৌসুমে মুলতাজামকে স্পর্শ করে দোয়া করা অত্যন্ত কঠিন। ভিড়ের কারণে অনেক সময় ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, যা ইহরামের পরিপন্থী।
তাই বর্তমান সময়ে মুলতাজাম সম্পর্কে মুমিনদের করণীয় হলো:
১) সুযোগের সদ্ব্যবহার: যদি কোনো কারণে সহজে ও শান্তভাবে মুলতাজামে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে দোয়া করা উচিত।
২) ভিড় এড়িয়ে চলা: যদি অতিরিক্ত ভিড় ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকে, তবে ভিড়ের মধ্যে জোর করে বা অন্যকে কষ্ট দিয়ে সেখানে যাওয়া উচিত নয়। ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হলো শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
৩) দূর থেকে ইশারা: যদি ভিড়ের কারণে কাবার দেয়ালে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তবে মুলতাজামের দিকে মুখ করে দূর থেকেও দোয়া করা যেতে পারে। ইশারা করে বা অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে দোয়া করলেও আল্লাহ তা কবুল করতে পারেন, কারণ আল্লাহ স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে।
৪) অন্যান্য স্থানে দোয়া: মসজিদুল হারামে মুলতাজিম ছাড়াও আরও বহু স্থান আছে, যেমন হাতিমের অভ্যন্তর, মাকামে ইবরাহিমের পেছনে, তাওয়াফের সময় এবং জমজমের কাছে, যেখানে দোয়া কবুল হয়। তাই মুলতাজামে যেতে না পারলে হতাশ না হয়ে এসব স্থানে মনোযোগ সহকারে দোয়া করা যেতে পারে।
পরিশেষেঃ-
কাবা শরীফের মুলতাজাম স্থানটি মুসলিম উম্মাহর কাছে আবেগের, ভক্তির এবং আত্মসমর্পণের প্রতীক। এটি আল্লাহর কাছে নিজের চাওয়া-পাওয়া, দুঃখ-কষ্ট এবং গুনাহের ক্ষমা চাওয়ার এক পবিত্রতম জায়গা।
আসুন, আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের প্রত্যেককে একবার হলেও এই পবিত্র স্থানে গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে তাঁর ঘরের দেওয়াল ধরে নিজেদের হৃদয়ের সব কথা তুলে ধরার সুযোগ করে দেন। আমিন






