“দৃঢ় প্রত্যয় ও আল্লাহর রহমতের প্রতীক“
সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে অবস্থিত সাফা (ٱلصَّفَا) ও মারওয়া (ٱلْمَرْوَة) দুটি ছোট পাহাড়, যা বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে। এই পবিত্র স্থানটি কেবল দুটি পাহাড়ের সমষ্টি নয়, বরং এটি এক মায়ের অবিশ্বাস্য প্রত্যয়, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার প্রতীক। হজ্জ ও উমরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যা ‘সাঈ’ নামে পরিচিত, তা এই দুই পাহাড়ের মাঝেই সাতবার আসা-যাওয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
সাফা ও মারওয়ার ঐতিহাসিক পটভূমিঃ মা হাজেরা (আঃ) এর অন্বেষণ
সাফা ও মারওয়ার ইতিহাস হাজার হাজার বছর পুরোনো, যা হযরত ইবরাহিম (আঃ)এর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) এবং তাঁদের শিশুপুত্র ইসমাইল (আঃ) এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইসলামি বর্ণনা অনুসারে, আল্লাহর আদেশে হযরত ইবরাহিম (আঃ) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুপুত্র ইসমাইল (আঃ) কে মক্কার জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে আসেন। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁদের খাবার ও পানীয় শেষ হয়ে যায়। পানির অভাবে মা হাজেরা (আঃ) যখন দেখলেন তাঁর সন্তানের জীবন বিপন্ন, তখন তিনি পানির সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠলেন।
- তিনি প্রথমে কাছাকাছি সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন এবং চারপাশের মরুভূমি দেখলেন কোনো কাফেলা বা পানির উৎসের সন্ধানে।
- কিছু দেখতে না পেয়ে তিনি দ্রুত পায়ে মারওয়া পাহাড়ের দিকে ছুটে গেলেন, সেখানেও একই উদ্দেশ্যে দেখলেন।
- এইভাবে তিনি একবার সাফা থেকে মারওয়া এবং আবার মারওয়া থেকে সাফা — মোট সাতবার দৌড়ালেন, যা তাঁর চরম সংগ্রাম ও আল্লাহর উপর ভরসার প্রতীক।
- সপ্তমবারে মারওয়া থেকে ফিরে এসে তিনি দেখলেন, ক্রন্দনরত শিশু ইসমাইল (আঃ) এর পায়ের আঘাতে বা আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ) এর আঘাতের ফলে মাটি ফেটে এক পানির ধারা বের হচ্ছে। এটিই আজকের জমজম কূপ।
হাজেরা (আঃ) এর এই আন্তরিক চেষ্টা, আত্মত্যাগ এবং চূড়ান্ত মুহূর্তে আল্লাহর উপর নির্ভরতার ফলেই জমজমের মতো অলৌকিক বরকতের ঝর্ণা সৃষ্টি হয়।
হজ্জ ও উমরাহে সাঈঃ একটি অবশ্যপালনীয় ইবাদত
সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাতবার আসা-যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে সাঈ (سَعِي) বলা হয়, যার আভিধানিক অর্থ হলো অনুসন্ধান বা দ্রুত হাঁটা। এটি হজ্জ ও উমরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
- শুরু ও শেষঃ সাঈ সবসময় সাফা পাহাড় থেকে শুরু হয় এবং মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে শেষ হয়। সাফা থেকে মারওয়া একটি চক্কর, এবং মারওয়া থেকে সাফা দ্বিতীয় চক্কর হিসেবে গণ্য হয়। এভাবে সাতটি চক্কর সম্পন্ন করতে হয়।
- দূরত্বঃ সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রায় ৩০০ মিটার (৯৮০ ফুট)। সাতবার আসা-যাওয়া করলে মোট প্রায় ২.১ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়।
- নিয়মঃ বর্তমানে এই দুই পাহাড় এবং মধ্যবর্তী পথটি মসজিদুল হারামের ভেতরে একটি দীর্ঘ গ্যালারির মধ্যে অবস্থিত। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের শীর্ষবিন্দুতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কাবা শরীফের দিকে মুখ করে দোয়া করা সুন্নাত। মধ্যবর্তী একটি নির্দিষ্ট স্থানে পুরুষদের জন্য দ্রুত পায়ে চলতে হয়।
সাফা ও মারওয়ার আধ্যাত্মিক শিক্ষা
পাহাড় দুটিকে মহান আল্লাহ কুরআনে তাঁর নিদর্শনসমূহের (شعائر الله – শা’আইরুল্লাহ) অন্যতম বলে ঘোষণা করেছেনঃ “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্গত। অতএব যে ব্যক্তি এই গৃহে হজ অথবা ‘ওমরাহ’ পালন করে তার জন্য এতদুভয়ের প্রদক্ষিণ করা দোষণীয় নয়, এবং কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎ কাজ করলে আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞাত।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৮)
সাফা ও মারওয়া মুসলিমদের জন্য নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেঃ
১) অবিচল প্রত্যয় ও ধৈর্যঃ এটি মা হাজেরা (আঃ) এর সেই অদম্য সংগ্রামকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা চরম প্রতিকূলতার মাঝেও আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে চালিয়ে যেতে শেখায়।
২) আল্লাহর প্রতি নির্ভরতাঃ এই ইবাদত মানব জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণভাবে ভরসা রাখার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।
৩) আশাবাদঃ এটি শেখায় যে, মানুষ যখন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ ও সাহায্য দিয়ে থাকেন, ঠিক যেমন জমজম কূপের অলৌকিক আবির্ভাব হয়েছিল।
সাফা ও মারওয়া শুধু দুটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং এটি মানব প্রচেষ্টা, মাতৃত্বের ভালোবাসা, দৃঢ় ধর্মবিশ্বাস এবং ঐশী রহমতের এক জীবন্ত প্রতীক।






