🕋 ওমরাহ পালনের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা: নিয়ম, পদ্ধতি ও করণীয়

Umrah Guide Bangla

ত্রুটিমুক্ত ওমরাহ পালনের A to Z: নিয়ম ও নির্দেশাবলী

ওমরাহ মুসলমানদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। একে ‘হজ আসগর’ বা ‘ছোট হজ’ বলা হয়। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পবিত্র কাবা শরীফ তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় কাজ সম্পন্ন করার নামই ওমরাহ। হজ নির্দিষ্ট মাসে অনুষ্ঠিত হলেও ওমরাহ বছরের যেকোনো সময় পালন করা যায়। জীবনে একবার ওমরাহ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।

এই নিবন্ধে আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে ওমরাহ পালনের ধারাবাহিক নিয়ম, ফরজ-ওয়াজিব এবং পুরুষ ও মহিলাদের জন্য বিশেষ নির্দেশনাসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরব।


১. ✨ওমরাহ: গুরুত্বওফজিলত

ওমরাহ-এর আভিধানিক অর্থ হলো “আবাদ স্থানের সংকল্প করা” বা “যিয়ারত করা”। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতির মাধ্যমে মক্কা মুকাররমায় গিয়ে বাইতুল্লাহ যিয়ারত করাই হলো ওমরাহ।

ওমরাহ পালনের ফজিলত:

  • গুনাহ মাফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “এক ওমরাহ থেকে অন্য ওমরাহ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হয়ে যাওয়া গুনাহসমূহের কাফ্ফারা (ক্ষতিপূরণ) হয়ে যায়, আর মাবরূর (কবুল) হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।” (সহিহ বুখারী)
  • দারিদ্র্য দূর: নবী করীম (সা.) বলেছেন, “তোমরা হজ ও ওমরাহ করো। কেননা, এ দুটো দারিদ্র্যতা ও গুনাহকে দূর করে দেয়, যেমন দূর করে দেয় কামারের ভাট্টি লোহা, সোনা ও রূপার মরিচিকা।” (তিরমিজি, নাসাঈ)
  • শ্রেষ্ঠ ইবাদত: এক বর্ণনায় এসেছে, ওমরাহ আল্লাহর পথে জিহাদের সমতুল্য।

২. 🕋 ওমরাহ পালনের ধাপসমূহ

ওমরাহ পালনের প্রধানত চারটি কাজ। এর মধ্যে দুটি কাজ ফরজ (যা অবশ্যই পালনীয়) এবং দুটি কাজ ওয়াজিব (যা না করলে দম/ক্ষতিপূরণ দিতে হয়)।

ক্রমকাজহুকুমবিবরণ
ইহরাম বাঁধাফরজওমরাহর নিয়তে নির্দিষ্ট স্থান (মিকাত) থেকে ইহরামের পোশাক পরিধান করা।
কাবা তাওয়াফ করাফরজকাবা শরীফের চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ করা।
সাফা-মারওয়া সাঈ করাওয়াজিবসাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার আসা-যাওয়া করা।
হলক বা কসর করা (চুল কাটা)ওয়াজিবমাথার চুল মুণ্ডন করা (পুরুষ) বা সামান্য ছেঁটে নেওয়া (মহিলা)।

৩. 🕌 ধারাবাহিক ওমরাহ পালনের নিয়ম

ওমরাহ পালনের প্রক্রিয়াকে সহজে বোঝার জন্য চারটি ধাপে ভাগ করা যায়:

১: ইহরাম বাঁধা (ওমরাহর প্রস্তুতি ও প্রবেশ)

ইহরাম হলো ওমরাহ পালনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মিকাত (ইহরাম বাঁধার জন্য নির্দিষ্ট স্থান) পার হওয়ার আগে ইহরাম বাঁধতে হয়।

ইহরামের পূর্ব প্রস্তুতি:

  1. শারীরিক পরিচ্ছন্নতা: হাত-পায়ের নখ কাটা, গোঁফ, চুল এবং নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা।
  2. গোসল: ফরজ গোসলের মতো গোসল করা সুন্নাত। (এমনকি মহিলাদের হায়েজ-নেফাস অবস্থায়ও গোসল করা সুন্নাত, তবে তাওয়াফ করা যাবে না।)
  3. সুগন্ধি ব্যবহার: পুরুষেরা শরীরে সুগন্ধি লাগাবেন (পোশাকে নয়)।

ইহরাম পরিধান:

  • পুরুষ: সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় পরিধান করবেন—একটি লুঙ্গির মতো কোমরে এবং অন্যটি চাদরের মতো কাঁধে। মাথা খোলা রাখবেন।
  • মহিলা: সাধারণ শালীন পোশাক পরবেন। মুখ খোলা রাখা উত্তম।

ইহরামের নিয়ত ও তালবিয়া:

  1. ২ রাকাত নফল নামাজ: ইহরামের পোশাক পরিধানের পর (মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে) ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করা।
  2. নিয়ত: কেবলামুখী হয়ে ওমরাহর নিয়ত করা। মুখে উচ্চারণ করা উত্তম:

اَللَّهُمَّ اِنِّي اُرِيْدُ العُمْرَةَ فَيَسِّرْهُ لِيْ وَ تَقَبَّلْهُ مِنِّي

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা ইন্নী উরিদুল উমরাতা ফাইয়াসসিরহু লী ওয়া তাক্বাব্বালহু মিন্নী।”

অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি ওমরাহ করার ইচ্ছা করছি, আপনি তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন।”

  1. তালবিয়া পাঠ: নিয়ত করার পরপরই সশব্দে তালবিয়া পাঠ শুরু করবেন। তালবিয়া মক্কা পৌঁছানো এবং তাওয়াফ শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত পাঠ করতে হয়।

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْك، لَا شَرِيكَ لَكَ.

উচ্চারণ: “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাকা।”

ইহরাম অবস্থায় বর্জনীয়:

ইহরামের নিয়ত করার পর কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়, যেমন: সেলাইযুক্ত পোশাক পরা (পুরুষদের জন্য), মাথায় বা মুখমণ্ডলে কাপড় দেওয়া, সুগন্ধি ব্যবহার করা, চুল বা নখ কাটা, শিকার করা, যৌন সম্ভোগ ইত্যাদি।

২: কাবা তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ)

মক্কায় পৌঁছে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে সরাসরি তাওয়াফ শুরু করতে হয়।

তাওয়াফের নিয়ম:

  1. ইজতিবা (পুরুষদের জন্য): তাওয়াফের শুরুতে পুরুষেরা ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর তুলে দেবেন (ডান কাঁধ খোলা থাকবে)।
  2. হাজরে আসওয়াদ: হাজরে আসওয়াদের (কালো পাথর) বরাবর এসে ডান হাত উপরে তুলে ইশারা করে বলবেন: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।”
  3. তাওয়াফ শুরু: হাজরে আসওয়াদ থেকে কাবাকে বাম দিকে রেখে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে তাওয়াফ শুরু করবেন।
  4. রমল (পুরুষদের জন্য): প্রথম তিন চক্করে পুরুষেরা ছোট ছোট পদক্ষেপে দ্রুত হাঁটবেন, একে ‘রমল’ বলে। বাকি চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন। মহিলাদের জন্য রমল নেই।
  5. রুকনে ইয়েমেনী: কাবা শরীফের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ রুকনে ইয়েমেনীতে পৌঁছালে সম্ভব হলে হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন, চুম্বন করবেন না।
  6. প্রতিটি চক্কর শেষে: প্রতিটি চক্কর হাজরে আসওয়াদের বরাবর এসে শেষ হবে এবং নতুন চক্কর শুরু হবে। মোট সাত চক্কর দিতে হবে।

তাওয়াফ-পরবর্তী কাজ:

  1. মাকামে ইবরাহিমে নামাজ: সাত চক্কর তাওয়াফ শেষ করার পর মাকামে ইবরাহিমের পিছনে বা হারামের যেকোনো স্থানে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা সুন্নাত। প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া উত্তম।
  2. জমজমের পানি: নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করা মুস্তাহাব। পান করার সময় দোয়া পড়বেন:

“আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফি’আ, ওয়ারিজক্বাও ওয়াসি’আ, ওয়াশিফাআম মিন কুল্লি দা’ঈ।” (হে আল্লাহ, আমাকে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক ও সকল রোগ থেকে আরোগ্য দান করুন!)

৩: সাঈ করা (দৌড়ানো)

তাওয়াফ ও নামাজ শেষে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের দিকে সাঈ করতে যেতে হবে।

সাঈর নিয়ম:

  1. সাফা পাহাড়: সাফা পাহাড়ের উপরে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দু’হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করবেন।
  2. শুরু: সাফা থেকে সাঈ শুরু করবেন। এটি প্রথম চক্কর।
  3. সবুজ বাতি: সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সবুজ চিহ্নিত স্থানে (পুরুষদের জন্য) দ্রুত দৌড়াতে হবে। মহিলারা স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন।
  4. মারওয়া পাহাড়: মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছে কাবার দিকে মুখ করে সাফার মতো দোয়া ও প্রশংসা করবেন। এটি দ্বিতীয় চক্কর।
  5. ফিরে আসা: মারওয়া থেকে সাফার দিকে আবার ফিরে আসবেন (এটি তৃতীয় চক্কর)। এভাবে মোট সাতবার আসা-যাওয়া করতে হবে। সাফা থেকে শুরু হয়ে মারওয়ায় শেষ হবে।
  6. সাঈর পর নামাজ: সাঈ শেষ হলে ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব।

৪: হলক বা কসর (চুল কাটা)

সাঈ শেষ হওয়ার পরই ইহরামের বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য চুল কাটতে হয়। এটি ওমরাহর শেষ কাজ।

  • পুরুষদের জন্য: মাথা মুণ্ডন করা (হলক) উত্তম। তবে মাথার সব চুল ছোট করে ছেঁটে ফেলাও (কসর) জায়েজ।
  • মহিলাদের জন্য: মাথার চুলের অগ্রভাগ থেকে এক আঙ্গুলের পরিমাণ বা সামান্য অংশ ছেঁটে নিতে হবে।

হলক বা কসর করার সাথে সাথেই ওমরাহ সম্পন্ন হয়ে যায় এবং ইহরামের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।


৪. 🚺 মহিলাদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা

মহিলাদের জন্য ওমরাহ পালনের পদ্ধতি পুরুষদের মতোই, তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে:

ক্ষেত্রপুরুষদের জন্যমহিলাদের জন্য
ইহরামের পোশাকসেলাইবিহীন সাদা কাপড়সাধারণ শালীন পোশাক (মুখ খোলা রাখতে হবে)
গোসলসুন্নাতহায়েজ/নেফাস অবস্থায়ও সুন্নাত (তবে তাওয়াফ করা নিষেধ)
রমল (তাওয়াফে দ্রুত হাঁটা)সুন্নাত (প্রথম ৩ চক্করে)নেই (সর্বদা স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন)
শব্দ করে তালবিয়াজোরে পাঠ করা সুন্নাতনিচু স্বরে পাঠ করবেন
চুল কাটা (হলক/কসর)মুণ্ডন (উত্তম) বা ছোট করাসামান্য চুল ছেঁটে নেওয়া
হায়েজ/নেফাসপ্রযোজ্য নয়পবিত্র হওয়ার আগ পর্যন্ত তাওয়াফ করতে পারবেন না, তবে ইহরাম ও সাঈ করতে পারবেন।

৫. 🌟 উপসংহার

ওমরাহ হলো আল্লাহ তাআলার সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন এবং আত্মার পরিশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। প্রতিটি কাজ করার সময় একাগ্রচিত্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। পবিত্র স্থানে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়, এই নিয়ত নিয়েই আমাদের ওমরাহ পালন করা উচিত।

ওমরাহ পালনের জন্য প্রতিটি নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে মহান আল্লাহ আপনার এই ইবাদতকে কবুল করেন এবং গুনাহসমূহ মাফ করে দেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমকে তার পবিত্র ঘর যিয়ারতের তৌফিক দান করেন।

Latest Post